নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যো
ন মেধয়া ন বহুনা শ্রুতেন।
যমেবৈষ বৃণুতে তেন লভ্যস্তস্যৈষ
আত্মা বিবৃণুতে তনুং স্বাম্॥৩
অন্বয়: অয়মাত্মা (এই আত্মা); প্রবচনেন (শাস্ত্র অধ্যয়নের দ্বারা); ন লভ্যঃ (লাভ করা যায় না); ন মেধয়া (বুদ্ধি বা বিচারশক্তির দ্বারা নয়); বহুনা (বার-বার); শ্রুতেন ন (শাস্ত্র-শ্রবণের দ্বারাও নয়); [যিনি] এষঃ (সে (সাধক]); যম্ এব (সেই পরমাত্মাকেই); বৃণুতে ( পেতে ইচ্ছা করেন); তেন (সেই [আন্তরিক] ইচ্ছার দ্বারাই); লভ্যঃ (লাভ করা যায়); তস্য (তাঁর [সেই সাধকের] কাছে); এষঃ আত্মা (এই আত্মা); স্বাম্ (নিজের); তনুম্ (স্বরূপ); বিবৃণুতে (প্রকাশ করেন)।
সরলার্থ: পাণ্ডিত্যের দ্বারা আত্মাকে লাভ করা যায় না, বুদ্ধি বা বিচার শক্তির দ্বারাও নয়। আবার শাস্ত্র শ্রবণের দ্বারাও তাঁকে পাওয়া যায় না। সাধকের আন্তরিক ইচ্ছার দ্বারাই তাঁকে লাভ করা যায়। সেই সাধকের কাছে তিনি নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেন।
ব্যাখ্যা: যা আয়ত্ত করা যেতে পারে, এমন বস্তু আত্মা নন। আবার আত্মা আমার থেকে পৃথক কোন বস্তুও নন। সুতরাং আত্মাকে অর্জন করাও যায় না। বস্তুকে যেভাবে আয়ত্ত করা হয় সেভাবে আত্মাকে আয়ত্ত করা যায় না। কারণ, যাকে আয়ত্ত করা হয় তাকে একদিন না একদিন ছেড়েও দিতে হয়। আমি আমার থেকে পৃথক কোন বস্তুকে অর্জন করতে পারি। কিন্তু আমি আমাকে অর্জন করব কেমন করে? আমাদের অন্তরতম সত্তাই হলেন এই আত্মা।
‘নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যঃ’—যুক্তিতর্কের দ্বারা এই আত্মাকে লাভ করা যায়। ‘মেধয়া’—বুদ্ধির দ্বারাও নয়। ‘ন বহুনা শুতেন’—আত্মতত্ত্ব সম্পর্কে অনেক শোনার পরেও তা দুর্বোধ্য বলে মনে হতে পারে। তবে তাঁকে কেমন করে পাওয়া যায়? ‘যম্ এব এষঃ বৃণুতে তেন লভ্যঃ’। এখানে ‘যম্’ বলতে আত্মাকে এবং ‘এষঃ’ বলতে সাধককে বোঝানো হয়েছে। সাধক যদি আন্তরিকভাবে এবং নিষ্ঠা সহকারে একমাত্র আত্মাকেই লাভ করতে চান তবে ‘তেন লভ্যঃ’—তার দ্বারা তিনি আত্মাকে উপলব্ধি করেন। অর্থাৎ আন্তরিকভাবে আত্মজ্ঞান লাভের চেষ্টা করতে হবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত আত্মজ্ঞান লাভ হয় ততক্ষণ এই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আত্মাকে বাইরে নয় নিজের ভেতরে খুঁজতে হবে6। হৃদয়দুয়ার যদি বন্ধ থাকে তবে সেই দরজায় করাঘাত করতে হবে। তবে একদিন না সেই দরজা খুলে যাবেই।
‘তস্য এষঃ আত্মা বিবৃণুতে তনুম্ স্বাম্’—সেই সাধকের কাছে (তস্য) আত্মা তখন নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেন। আত্মা তখন নিজেকেই প্রকাশ করেন। এর ফলে সহসা যেন আমি আমাকেই আবিষ্কার করি। এ যেন দু হাত দিয়ে চোখ ঢেকে রেখে বলছি, ‘হায়! আমি দেখতে পাচ্ছি না।’ তখন কেউ এসে আমার হাতটা সরিয়ে দেন। তিনি গুরু হতে পারেন, শাস্ত্র হতে পারেন কিংবা কোন উপলব্ধিও হতে পারে। কিন্তু যে-মুহূর্তে হাত দুটো সরে যায় সেই মুহূর্তেই দেখা যায়। আত্মসাক্ষাৎকার ঠিক এভাবেই হয়।